রেকমেন্ডেশন লেটার (letter of Recommendation)

আমেরিকার এ্যাডমিশনের ক্ষেত্রে স্টেটমেন্ট অফ পারপাজের সমপরিমাণ বা কখনো কখনো তার চাইতে বেশি গুরুত্ব বহন করে সেটা হচ্ছে এই রেকমেন্ডেশন লেটার।আপনি ছাত্র হিসেবে কেমন,পেশাগত জীবনে কেমন,ভবিষ্যতে আপনার গবেষণা বা পড়াশোনায় সফল হবার সম্ভাবনা কতটুকু,আপনার ভেতরে এমন কোনও গুণ আছে কিনা যা আপনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে এপ্লাই করেছেন সেটার সাথে খুব ভালোভাবে খাপ খায়- এই জিনিসগুলো বর্ণিত হয় রেকমেন্ডেশন লেটারে।

কিভাবে রেকমেন্ডার সিলেক্ট করবেন?

একেক প্রোগ্রামে একেক ভাবে রেকমেন্ডার চেয়ে থাকে। আমার প্রোগ্রামে রেকমেন্ডার চেয়েছিল তিন জন,এদের মধ্যে দুজন প্রফেশনাল এবং একজন একাডেমিক। আপনি এমন মানুষদের রেকমেন্ডার হিসেবে সিলেক্ট করবেন যারা এক) আপনাকে ভালোভাবে চেনে দুই) আপনার সাথে প্রফেশনাল বা একাডেমিক পর্যায়ে সুপারভাইজ করেছেন এবং তিন) আপনার সম্পর্কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন।

একটা প্রচলিত ভুল ধারণা হচ্ছে,বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতে হলে খুব বড় বড় নামকরা মানুষের কাছ থেকে রেকমেন্ডেশন লেটার নিতে হবে।হার্ভার্ডে এপ্লাই করার সময় আমার ধারণা ছিল প্রফেসর ইউনুস,স্যার ফজলে হাসান আবেদ বা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী- এই পর্যায়ের কারো কাছ থেকে রেকমেন্ডেশন না নিলে জীবনেও চান্স পাওয়া যাবেনা।মুশকিল হচ্ছে,এই পর্যায়ের কাউকে আমি সরাসরি ব্যক্তিগত পর্যায়ে চিনি না,তাঁদের কারো সাথে আমি প্রফেশনালি কাজ করিনি। কাজেই,এঁদের কাছ থেকে রেকমেন্ডেশন লেটার পাবার সম্ভাবনা শূন্য।

 

কি করা যায়?ঠিক করলাম যা আছে কপালে- আমি এমন সব মানুষের কাছ থেকে রেকমেন্ডেশন নেবো যারা আসলেই আমাকে ভালোভাবে চেনেন,আমার সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন। হার্ভার্ডে আমার রেকমেন্ডার হিসেবে নির্বাচন করলাম তিনজনঃ
এক) আমার আন্ডারগ্রাড রিসার্চ সুপারভাইজর (নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়)
দুই) পুলিশ সুপার বান্দরবান ( আমি যাঁর অধীনে সরাসরি কাজ করতাম)
তিন) পুলিশ সুপার,স্পেশাল ব্রাঞ্চ ( এই স্যারের অধীনে স্পেশাল ব্রাঞ্চের একটি কোর্সে আমি প্রথম হয়েছিলাম)

 

এঁরা কেউ নোবেল বিজয়ী বা নাইটহুড প্রাপ্ত নন,কিন্তু আমাকে ভালভাবে চেনেন। অনুরোধ করতেই সানন্দে রাজি হলেন।

 

এটা ঠিক,বিখ্যাত কেউ যদি আপনার সরাসরি প্রফেশনাল বা একাডেমিক পর্যায়ে পরিচিত থাকে এবং আপনাকে ভালোভাবে চেনে- তাঁদের রেকমেন্ডেশন আপনার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু যদি তা না হয়- শুধু নামের উপর ভিত্তি করে একে ওকে দিয়ে সুপারিশ করিয়ে যদি আপনি রেকমেন্ডেশন যোগাড়ও করে থাকেন- এবং সেই রেকমেন্ডেশন যদি দায়সারা হয়- সেটা বিশ্ববিখ্যাত কেউ দিলেও আপনার এ্যাডমিশনে খুব একটা সহায়তা করবেনা।

 

একটা ভালো রেকমেন্ডেশন লেটারের কিছু বৈশিষ্ট্য আছেঃ

 

ক) এটা হতে হবে এমন কারো কাছ থেকে যে সরাসরি চাকুরীতে বা একাডেমিকালি আপনাকে সুপারভাইজ করেছে

খ) আপনার যে গুণটি তিনি বর্ণনা করবেন- এই বর্ণনা দায়সারা হবেনা,এতে বিস্তারিত বিবরণ থাকবে।ধরা যাক,সাকিব আল হাসান এমআইটির ক্রিকেট স্টাডিজ বিভাগে মাস্টার্সের জন্য আবেদন করেছেন।তিনি যখন রেকমেন্ডেশন নিতে যাবেন- তখন রেকমেন্ডেশন লেটারে দু ধরণের বর্ণনা হতে পারে।

দায়সারা বর্ণনাঃ  “সাকিব আল হাসান খুব ভালো ক্রিকেটার”

 

 

ভাল বর্ণনাঃ “সাকিবআল হাসান বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটারদের একজন,বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সে-ই বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার হবার গৌরব অর্জন করেছে। ওর বাঁহাতি স্পিন বোলিং এবং মিডল অর্ডার ব্যাটিং বাংলাদেশ দলের জন্য অমূল্য সম্পদ। দলের প্রয়োজনে সে কঠোর পরিশ্রম করে এবং নিজের সর্বোচ্চটা দেবার চেষ্টা করে।অস্ট্রেলিয়ার সাথে ওয়ানডে ম্যাচে একশ চার ডিগ্রি জ্বর নিয়েও সে মাঠে নেমেছে এবং হাফ সেঞ্চুরি করে দলকে জিতিয়েছে- যেটা তার দলের প্রতি আনুগত্য,একাগ্রতা এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞার পরিচয় বহন করে। ওর সাবেক কোচ হিসেবে আমি মনে করি,এরকম একজন খেলোয়াড়কে নিয়ে কাজ করলে এমআইটি ক্রিকেট স্টাডিজ বিভাগ যেমন উপকৃত হবে,একইভাবে সাকিবও এমআইটির গবেষণা থেকে নিজেকে ঋদ্ধ করে আরও ভালভাবে বিশ্ব ক্রিকেটে অবদান রাখতে পারবে”।

 

আপনার রেকমেন্ডেশন যিনি দেবেন,তাঁর সাথে বার বার দেখা করে এই বিষয়গুলো ভালোভাবে আলোচনা করে নিশ্চিত হয়ে নেবেন যেন রেকমেন্ডেশনের বর্ণনা দ্বিতীয়টির মত হয়। যেহেতু এটা কনফিডেনশিয়াল এবং ছাত্রের জানার কথা না- কাজেই যেসব রেকমেন্ডারের প্রতি আপনার পূর্ণ আস্থা আছে যে তিনি উল্টাপাল্টা কিছু লিখবেন না- এমন লোকদেরকে নির্বাচন করবেন রেকমেন্ডেশনের জন্য।

 

রেকমেন্ডেশন জোগাড়ের কাজটা শুরু করবেন অন্ততঃ মাস খানেক সময় হাতে রেখে- রেকমেন্ডেশন লেটার যদি ডেডলাইনের  ভেতরে না পৌঁছে,সেক্ষেত্রে আপনার সব পরিশ্রম জলে যাবার সম্ভাবনা আছে। অতএব,সাধু সাবধান!

 

 

মাসরুফ হোসেন

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়

কেমব্রিজ,ম্যাসাচুসেটস

যুক্তরাষ্ট্র

[email protected]

Comments

comments