20121111065603-2d29054a

‎বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পুত্র সংক্রান্ত বিতর্ক প্রসঙ্গে‬

(আপনাদের যাদের সময় কম তাঁরা দয়া করে আমার সুদীর্ঘ ভূমিকাতে সময় নষ্ট না করে সরাসরি হ্যাশ-ট্যাগ দেয়া পয়েন্ট দুটো দেখে নিন। ওটুকুই যথেষ্ট, হাতে সময় না থাকলে বিশ্লেষণ পড়বার দরকার নেই)

সম্প্রতি ফেসবুকে বেশ জোরেশোরে একটি দাবী করা হয়েছে যে অর্থাভাবে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পুত্র শওকত মানবেতর জীবন যাপন করছেন।আজকের লেখায় এ প্রসঙ্গে আমার মতামত প্রকাশ করছি।

প্রথম প্রশ্নঃ বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে কি আমরা তাঁদের প্রাপ্য সম্মান দিতে পেরেছি?

এ প্রসঙ্গে আমার মতামত হচ্ছে, তাঁদেরকে যেভাবে সম্মান করা দরকার ছিল তার অর্ধেকও সম্ভবত আমরা করতে পারিনি।এর কারণ নানাবিধঃ

মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির বিপরীতে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির পদচারণা, তরুণ প্রজন্মের উদাসীনতা, দেশে বিদ্যমান দুর্নীতি, জাতি হিসেবে আমাদের নীচতা ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমার স্ট্যাটাস আসলে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সুবিশাল বিষয়টি ধারণ করতে পারবেনা। আমি খুব ছোট, সুনির্দিষ্ট একটি বিষয়ে আমার মতামত উপযুক্ত সূত্র উল্লেখ করে প্রদান করতে যাচ্ছি। বিষয়টি সাদামাটাভাবে উপস্থাপন করলে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছেঃ

“এই দ্যাখ, দ্যাশে বীরশ্রেষ্ঠের পোলার পেটে খানা নাই আর ওইদিকে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়া লাফালাফি।”

এই জাতীয় দাবী ছাগুকূল নতুন করছে না। পদ্মা সেতু, শেয়ার কেলেঙ্কারি, সাগর রুনি থেকে শুরু করে সাপ কিভাবে স্বর্গের গেইট পার হয়ে গন্ধম ফল বিবি হাওয়াকে খাওয়ালো- এমন কোনও বিষয় নেই যেটার মাধ্যমে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি এই যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেনা। এই দাবীগুলোর মধ্যে সর্বশেষ সংযোজন বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পুত্র শওকতের দৈন্যদশাকে পুঁজি করে আবেগী ব্যবসা।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একজন বাঙালি হিসেবে আমি প্রচণ্ড আবেগ বোধ করি- সেই আবেগ থেকেই খুঁজতে চেয়েছিলাম এ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরঃ আসলেই কি বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পুত্রের এই দৈন্যদশা?

প্রিয় পাঠক, আমি আবারও বলছি- এ কথা নতমুখে এবং লজ্জার সাথে আমি স্বীকার করি যে মুক্তিযোদ্ধাদের তাঁদের প্রাপ্য সম্মান আমরা দিতে পারিনি, শত শত মুক্তিযোদ্ধা অনাহারে অর্ধাহারে মারা গিয়েছেন। তাহলে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পুত্রের ব্যাপারে আলাদা করে মাতামাতির কারণ কি?

কারণ একটাইঃ বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন আমাদের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর একটা প্রতীকী মূল্য আছে, আছে একটা আবেগী মূল্য- যেটা সাত রাজার ধন দিয়েও পাওয়া যাবেনা। কোনভাবে যদি এটা দেখানো যায় যে এদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বীরদেরকেই পাত্তা দেয়া হচ্ছেনা আর বাকিরা তো কোন ছাড়- তাহলে গোটা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টাকেই বিতর্কিত করার সুযোগ পাওয়া যায়।এ কারণেই ছাগুকূল বারংবার এই অপচেষ্টাটি করে যাচ্ছে।

আর ঠিক এ কারণেই বার বার আমাদেরকে এর জবাব দিতে হবে।

জবাবটি যদি “না” হয় তাহলে এই অপপ্রচার খণ্ডন করতে হবে, আর জবাবটি যদি “হ্যাঁ” হয় সেক্ষেত্রে এর প্রতিকারে যা যা করা সম্ভব (ফান্ড রেইজিং, সরকারী/বেসরকারী অনুদান ইত্যাদি) সবকিছু করতে হবে।

দুটি অপশনই খোলা রইল। “আমি যা বলেছি সেটার উপরে আর কোন কথা নেই”- এরকম বালখিল্যসুলভ এবং উৎকট দাবী করার মত ধৃষ্টতা তথাকথিত ছদ্মবুদ্ধিজীবীদের থাকতে পারে, এই অধম তা থেকে মুক্ত।

আমি পেশাদার সাংবাদিক নই, তাছাড়া রয়েছি দেশ থেকে হাজার মেইল দূরে সুর্যোদয়ের দেশের রাজধানীতে।এ স্ট্যাটাসে প্রদত্ত তথ্যগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, দেশের বাইরে থাকায় নিজে গিয়ে পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষভাবে তথ্যগুলো সম্পূর্ণ করতে পারিনি। তবে আমার ক্ষুদ্র সামর্থ্যে যে কাজটি করতে চেয়েছি তা হচ্ছে নিজে যাচাই করে একটা স্টার্টিং পয়েন্ট দাঁড় করানো- যেটার উপর ভিত্তি করে দেশে থাকা কোন সহৃদয় ব্লগার/সাংবাদিক হয়ত একটা ভাল রেফারেন্স ব্লগ দাঁড় করাতে পারবেন।যে তথ্যগুলো আমি দিতে যাচ্ছি তার কিছু কিছু মিডিয়াতে এসেছে, সেগুলোর একটি সারসংক্ষেপ দেবার পর যে কাজটি করছি, তা হচ্ছে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পুত্র শওকতের আর্থিক উপার্জন এবং সরকার তাকে সহায়তা করে নাকি করেনা এ বিষয়ে আলোকপাত।

দেশে থাকলে প্রতিটা তথ্য নিজে যাচাই করতে পারতাম। সেটি যেহেতু সম্ভব নয়, এই যাচাইযোগ্য তথ্যগুলো আপনারা যে কেউ নিজ উদ্যেগে যাচাই করে নিতে পারেন।

রাম,শ্যাম, যদু, মধু টাইপ সূত্রের বদলে আমি যাঁর সাথে কথা বলেছি তাঁর নাম সাব লেফটেন্যান্ট আবরার হাসান, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাব-লেফটেন্যান্ট, বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ফ্রিগেট বি এন এস ওসমানে কর্মরত। তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একজন কমিশন্ড, প্রথম শ্রেনীর অফিসার- সেই সাথে তাঁর বড় পরিচয় হচ্ছে তাঁর আপন নানাই হচ্ছেন বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের কণিষ্ঠা কন্যা ফাতেমা বেগম ( বর্তমানে চট্টগ্রাম ক্যান্ট পাবলিক কলেজের শিক্ষিকা)- এর পুত্র হচ্ছেন এই আবরার হাসান।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল বা উদ্ভট কোনও সুত্রের চাইতে এই সূত্রটিকে আমি গুরুত্ব দিয়েছি তিনটি কারণেঃ

১) তিনি বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের আপন নাতি
২) তিনি বাংলাদেশ সরকারের একজন প্রথম শ্রেনীর দায়িত্বপূর্ণ কর্মকর্তা এবং
৩) তাঁর দেয়া তথ্যগুলো যাচাই করা সম্ভব।

বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ছয়টা ছাব্বিশ মিনিটে আমি টোকিও থেকে তাঁর সাথে ফোনে যোগাযোগ করি
( প্রথম যোগাযোগ ফেসবুকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছোটভাইইয়ের দেয়া সূত্রের মাধ্যমে) । তিনি পরবর্তীতে ফেসবুকে আমাকে যেসব তথ্য দেন তার ভিত্তিতে এই লেখাটি। এ সংক্রান্ত প্রমাণ আমার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে, কেউ অতিমাত্রায় ত্যানা প্যাঁচালে দেয়া যাবে। আপাততঃ তাঁর বক্তব্য শুনিঃ

বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পারিবারিক অবস্থাঃ‬

11838525_1626348674308764_7238421881177870064_oপুত্র শওকতকে দিনমজুর দেখিয়ে যখন জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের পরিবার সম্পর্কে বলা হয় “মানবেতর” জীবন যাপন করছে, চলুন দেখে নিই বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পাঁচ সন্তান কে কেমন আছেনঃ (পাশের ছবিটি ক্লিক করলে বড় করে দেখা যাবে)

জ্যেষ্ঠ পুত্র আলী বাহার মার্চেন্ট শীপের ক্যাপটেন ছিলেন, ১৯৯৮ সালে মারা গিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী এবং একমাত্র পুত্র লণ্ডনে থাকেন।

বড় এবং মেঝ কন্যা চট্টগ্রামের সবচাইতে অভিজাত এলাকা খুলশীতে থাকেন। বড় কন্যা একটি সিকিউরিটি কোম্পানির মালিক, তাঁর পুত্রকন্যারা সবাই প্রতিষ্ঠিত। মেঝ কন্যা গৃহিনী।

ছোট কন্যা, সাব লেফটেনেন্ট আবরার হাসানের মা ফাতেমা বেগম থাকেন চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের পাশে- তিনি চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের শিক্ষিকা।

যাঁকে ঘিরে এত আলোচনা, সেই ছোট পুত্র শওকত থাকেন নোয়াখালিতে, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নোয়াখালিস্থ বাড়িতে। তাঁর স্ত্রী ও এক কন্যা রয়েছে এবং মানসিকভাবে তিনি অসুস্থ্য।

কনিষ্ঠ পুত্র শওকতের আর্থিক অবস্থাঃ‬

এটা সত্যি যে মানসিকভাবে কিছুটা ভারসাম্যহীন হবার কারণে পরিবারের অন্যদের তুলনায় তাঁর আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। কিন্তু তিনি ভিক্ষা করেন/ খেতে পাননা/ মানবেতর জীবন যাপন করেন এধরণের কথাবার্তা এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আমার কাছে সম্পূর্ণ ভুল বলে মনে হয়েছে। সাব লেফটেনেন্ট আবরার হাসান আমাকে তাঁর মামা শওকত সাহেবের আর্থিক আয় সম্পর্কে খসড়া একটি তথ্য দিয়েছেন যা আপনাদের সুবিধার্থে তুলে দিচ্ছিঃ

একঃ বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবাদের দেখভাল করবার জন্যে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী আর্থিক ভাতা দিয়ে থাকে। শওকত সাহেবের নামে বাংলাদেশ নৌবাহিনী “ট্রাস্ট ব্যাংকে” একটি একাউন্ট খুলেছে যেখানে প্রতিমাসে তাঁর জন্যে প্রায় সাত হাজার টাকা জমা হয়, সেই সাথে নৌবাহিনীর রেশনও তাঁর জন্যে বরাদ্দ।

দুইঃ‬ সাব লেফটেনেন্ট আবরার সাহেবদের পরিবার থেকে প্রতিমাসে তাঁকে দশ হাজার টাকা পাঠানো হয়।

তিনঃ নোয়াখালিতে যত জমি এবং পুকুর আছে সেটা থেকেও ধান এবং মাছ বিক্রির টাকার একটা অংশ তিনি পান।

সাব লেফটেনেন্ট আবরার হাসান সাহেবের মতে, তাঁর মামা শওকত সাহেবের মানসিক ভারসাম্যহীনতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেনীর মানুষ তাঁর সাথে ছবি তুলে সেটাকে পাবলিক ফিগার বানিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছে। এরা মানুষের ইমোশনের জায়গাটাকে কাজে লাগিয়ে টাকা সংগ্রহ করে অনেক ক্ষেত্রেই সেটা গায়েব করে করে দেয়। এই হচ্ছে আসল কাহিনী।

এবার কিছু ডিসক্লেইমার দিয়ে নেইঃ

১) যেহেতু এই ব্লগের ভিত্তি বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্যারের আপন নাতি, এবং তিনিও একজন মানুষ- তাঁর দেয়া খসড়া তথ্যগুলো যাচাই করে নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে নৌবাহিনীর কাছে আবেদন করে অনুমতিসাপেক্ষে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেয়া যেতে পারে।

২) আবারও বলছি, আমার এ লেখাটি কনক্লুসিভ প্রমাণ নয়, এখানে উল্লিখিত তথ্যগুলো যাচাই বাছাই করার সুযোগ পুরোমাত্রায় রয়েছে। আমি পেশাদার সাংবাদিক নই এবং এ লেখার ভিত্তি টেলিফোনের সাক্ষাৎকার, যেখানে সাক্ষাৎকারদাতা স্মৃতি থেকে কথা বলেছেন। টুকিটাকি ভুলত্রুটি থাকলে সংশোধন করে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব।

৩) যদি কোনও সহৃদয় ব্যক্তি এই বিষয়টির উপর ডিটেইল কাজ করেন, শওকত ও তাঁর পরিবার এবং সেই সাথে তাঁর বাকি ভাইবোনদের সাক্ষাৎকার নেন- তাহলে হয়ত আরও নতুন নতুন তথ্য উঠে আসতে পারে।

৪) নতুন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আমার এ লেখাটি ভুল প্রমাণিত হলে সেটি মেনে নিতে বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। আমি শুধু একটি স্টার্টিং পয়েন্ট দাঁর করাতে চেয়েছি। সুদূর টোকিওতে বসে এর বেশি কিছু করা সম্ভব হয়নি, এজন্যে ক্ষমা চাইছি।

৫) ইচ্ছে করেই সাব লেফটেনেন্ট আবরার হাসানের ফেসবুক আইডি দিলাম না। তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে অফিশিয়ালি করুন।তিনি কঠোর একটি সরকারী চাকুরি করেন- স্রেফ দয়া করে আমাকে এসব তথ্য দিয়েছেন। তাঁর বিন্দুমাত্র অসুবিধা করার প্রচেষ্টা করা হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।

৬) মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা করে কিছু বলা, ত্যানা প্যাঁচানো, অপ্রাসঙ্গিক কিছু টানা- এসব করামাত্র ব্লক খাবেন।

৭) জ্ঞানতঃ কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে এই পোস্টটি দেইনি। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে অনুদান সংগ্রহকারী সবাই যে অসাধু এটাও বলছিনা।আমার তথ্যে হয়ত ফাঁক রয়ে গিয়েছে কোথাও। এরকম যদি হয়, নিজের গায়ের জোর/ইগো ইত্যাদি না দেখিয়ে ভুলগুলো ঠান্ডা মাথায় ধরিয়ে দিন। আপনি কত বড় কেষ্ট-বিষ্টু তা জানতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই আমার।

ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা।

Comments

comments