হার্ভার্ডের দিনলিপি ০০৬

ক্লাস পুরোদমে শুরু হয়েছে, দুই সপ্তাহ শেষ করে তৃতীয় সপ্তাহে পা রেখেছি। ঝড়ের গতিতে এ্যাসাইনমেন্ট, কুইজ ইত্যাদি আসা শুরু হয়েছে, পা পিছলালেই শেষ। আজ ক্লাস ছিল প্রফেসর এরিক রোজেনবার্গের- সাইবার সিকিউরিটি এবং আইন নিয়ে। এখানে ক্লাস করতে হলে আগে থেকে একগাদা আর্টিকেল আর রিডিং ম্যাটেরিয়াল পড়ে যেতে হয় যাতে ক্লাসে অংশগ্রহণ করা যায়। সেমিস্টারের শুরুতেই সিলেবাসে লেখা থাকে কোন ক্লাসের জন্য কি কি পড়তে হবে। সারাজীবনে আর কিছু করিনাই বই পড়া ছাড়া- এই জিনিসটা এখানে রীতিমত আমার জীবন রক্ষা করছে। ক্লাসে প্রায় আশি জন ছাত্রছাত্রী- এরা এসেছে এমআইটি,স্ট্যানফোর্ড ইত্যাদি এলিট স্কুল থেকে, বিভিন্ন পেশা থেকে। ইউ এস নেভীর একজন জ্যাগ ( জাজ এ্যান্ড এ্যাডজুডিকেটর জেনারেল, যিনি কোর্টমার্শাল পরিচালনা করেন) ভদ্রমহিলাও আমাদের সহপাঠী। অফিসের ফাঁকে ফাঁকে ছুটি নিয়ে ক্লাস করে এক নেভী ক্যাপ্টেন, তাকে ইউনিফর্মে ক্লাসে ঢুকতে দেখে প্রফেসর মাঝে মাঝেই রসিকতা করেন- “ইউনিফর্ম দেখিয়ে লাভ নাই, পড়াশোনা ঠিক মত করতে পারো তো?” এরকম বলে। আমার বামপাশে বসে বিল, ইউ এস এয়ারফোর্সের মেজর- ফাইটার প্লেন চালায়। কি একটা অপারেশনে পা ভেঙে এক বছর রেস্ট পেয়েছে- এই সময়টা কাজে লাগিয়ে হার্ভার্ডে পড়তে এসেছে। ডান পাশে বসা রায়না স্ট্যানফোর্ডে আন্ডারগ্র্যাড করেছে- এখানে এসেছে মাস্টার্স করতে।প্রথম সপ্তাহে এদের একেকজনের প্রোফাইল দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম- “আল্লাহ রে, এইডা কুন জায়গায় আইলাম” টাইপ চিন্তা মাথায় জেঁকে বসেছিল। অরিয়েন্টেশনের একটা সেশন ছিল শুধুমাত্র এই বিষয়টা নিয়ে, আমি দেশে থাকায় এ্যাটেন্ড করতে পারিনি। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে একটা নিউজপেপার বের হয় “হার্বাস” নামে, যেটা ফ্রিতে ছাত্রছাত্রীরা সংগ্রহ করতে পারে। ওখানে দেখলাম “রাইট টু মিতা” টাইপ একটা কলাম আছে- ছাত্রছাত্রীরা মজা করে নিজেদের নানা সমস্যা লেখে আর সেটার উত্তর পায়। এরকম একটা চিঠি দেখলাম- “এখানে এসে আমার মনে হচ্ছে নিশ্চয়ই বিশাল কোনও ভুল হয়েছে এ্যাডমিশন কমিটির, আমার মত গাধা এই অসাধারণ সব মেধাবীদের মধ্যে কিভাবে আসলো ? ক্লাসে হাঁ করে অন্যদের কথা শুনি আর ভাবি, আমি তো এদের নখের যোগ্যও না, কিভাবে ক্লাস করব এদের সাথে?”

এই যে ধারণাটা, নামকরা বা প্রচণ্ড কম্পিটিটিভ যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা প্রতিটা ছাত্রছাত্রী এর ভেতর দিয়ে যায়। এটাকে বলে Imposter Syndrome, নিজেকে অন্যদের তুলনায় অযোগ্য এবং ঠগবাজ ভাবা। এইটা কাটাতে হার্ভার্ডে যেটা করে এটা মোটামুটি কিংবদন্তীর পর্যায়ে চলে গিয়েছেঃ

অরিয়েন্টেশনের সময় এ্যাডমিশন কমিটিতে থাকা একজন প্রফেসর সব ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞাসা করেন- “তোমরা কে কে মনে কর যে এখানে পড়তে আসা বাকি সবাই তোমাদের চাইতে অনেক স্মার্ট, এখানে পড়তে আসার যোগ্যতা তোমাদের নেই কিন্তু ভুল করে এ্যাডমিশন পেয়েছ?”- বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সিংহভাগ ছাত্রছাত্রী হাত তোলে। পরের প্রশ্নটা এরকম- “তোমরা কে কে মনে করো হার্ভার্ড একটা দারুণ বিশ্ববিদ্যালয়?”- এবার সবাই হাত তোলে। প্রফেসর তখন বলেন, “আচ্ছা, তোমাদের মতে হার্ভার্ড একটা দারুণ বিশ্ববিদ্যালয়, তাহলে কেন তোমাদের এরকম মনে হচ্ছে যে এটার এ্যাডমিশন কমিটিতে সব স্টুপিড লোকজন বসে আছে যারা ভুল করে সব গরুগাধাকে এ্যাডমিশন দিয়েছে?”- এই পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীরা সাহস পায় যে , তারা নিজেদেরকে যতটা গরুগাধা ভাবে তারা আসলে ততটা গাধা না। তবে আমার কথা আলাদা, আমি অরিয়েন্টেশনের এই সেশন মিস করেছি, কাজেই নিজেকে এখনও গরুগাধাই ভাবি।

এরিক রোজেনবার্গের ক্লাসের কথা বলি। উনি ক্লাসে খুব দৃঢ়তার সাথে বললেন, আন্তর্জাতিক আইনের সাথে মেলেনা এমন কোনওকিছু আমেরিকান প্রেসিডেন্ট মত দেন না। জ্যাগ ভদ্রমহিলা সেটা সমর্থন করলেন।আমি হাত তুলে বললাম, “আচ্ছা, তাহলে এই যে তোমরা একটা অন্য দেশের আন্তর্জাতিক সীমা লঙ্ঘন করে সীল টিম সিক্স পাঠিয়ে লাদেনকে মেরে এসেছ, এইটা তাহলে কি?”

এই প্রথম প্রফেসরকে দেখলাম একটু আমতা আমতা করতে-তবে সেটা খুব অল্প সময়ের জন্য।সাথে সাথে বললেন, না মানে, এইটা তো সেলফ ডিফেন্স।বলে একটা মুচকি হাসি দিলেন- দুষ্টুমি করে ধরা পরার পর বাচ্চারা যেভাবে হাসি দেয় সেভাবে। তারপর ব্যাখ্যা করলেন, আমাদের আইনে আছে ন্যাশনাল সিকিউরিটির খাতিরে প্রয়োজনে আমরা আমেরিকার জনগণ এবং বহির্বিশ্বকে অন্ধকারে রেখে সিক্রেট অপারেশন চালিয়েও নিজেদের কার্য উদ্ধার করতে পারি।

সেই সাথে উনি জানালেন, এগজিকিউটিভ অর্ডার কি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট চাইলে সংবিধান এবং আইনের সাথে সঙ্গতি আছে এমন যে কোনও কিছু আদেশ আকারে সাইন করে পাস করে ফেলতে পারে- যেটা দেশের আইনের মতই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।

ক্লাস শেষে পাশে বসা রায়না বলল-ভাল ধরা দিয়েছ বেটাকে, সাবাস!

এই যে ক্লাসমেট হিসেবে এক এক জন রত্নের সাথে বসছি, হার্ভার্ডে আমার কাছে এটাকেই সবচেয়ে স্পেশাল জিনিস বলে মনে হয় যেটা পৃথিবীর খুব কম জায়গাই আছে দিতে পারবে। প্রফেসর একটা আলোচনা শুরু করেন, সেটার উপর ভিত্তি করে ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা অসাধারণ সব মতামত দেয়। আমি নাম সহ সবার মন্তব্য টুকে রাখতে চেষ্টা করি। প্রফেসর তো আছেনই, আমার সহপাঠীরাও আমার শিক্ষক, তারাই আমার পথপ্রদর্শক, পরম সুহৃদ।

আমেরিকায় পা রাখার আগ পর্যন্ত প্রচণ্ড ভয়ে ছিলাম, ইমিগ্রেশন নিয়ে নানারকম হরর স্টোরি শুনেছি। এমাইটিতে আসা বুয়েটের এক ছোটভাইকে দেড় ঘণ্টা আটকে রেখেছিল এই সেশনেই। সেদিন ভালোয় ভালোয় সব কেটে গিয়েছিলো কোনওরকম ঝামেলা ছাড়াই। আমেরিকায় আমার প্রথম দিন কোথায় কেটেছে জানেন? বোস্টন হার্বাররে রোয়ি’স ক্লাবের ইয়াটে, সহপাঠীদের সাথে রিভার ক্রুজে। সেদিন ছিল অরিয়েন্টেশনের শেষ দিন, আগের তিন দিন ধরতে পারিনি। প্রায় আশি জন ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আমি একমাত্র বাংলাদেশি দুই বছরের পাবলিক এ্যাডমিনিস্ট্রেশন মাস্টার্স প্রোগ্রামে। ইন্ডিয়ান ছিল চার পাঁচ জন, দেখে খারাপ লাগল একটু, বাংলাদেশ থেকে আমি একা বলে। রিভার ক্রুজ শেষে পার্টি ছিল একটা বারে- গেলাম সবার সাথে। জেট ল্যাগ তখনও কবজা করতে পারেনাই- এক্সাইটমেন্ট এর কারণে হয়তোবা।ড্রিঙ্ক সার্ভ করা হচ্ছে, খাবার সহ- একটা বিশাল পানীয়পাত্রে পাঁচ ছয়টা স্ট্র বসিয়ে একসাথে পানীয় পান করছে গ্রুপ ধরে ধরে, সেই সাথে পাশেই চলছে কারাওকে গান। এটা মোটামুটি আইস ব্রেকিং সেশন- সবাই সবার সাথে পরিচিত হচ্ছে এর মাধ্যমে।আমি একেকজনের সাথে কথা বলছি, তাদের সম্পর্কে জানছি আর মুগ্ধ হচ্ছি।

ব্রাজিলের একজনের সাথে পরিচয় হল, এলিজা নাম। ছ ফুট লম্বা, চাবুকের মত টানটান দেহশ্রী। আমি এর আগে এত লম্বা কোনও মেয়ে দেখিনি, টিপিকাল বাঙালিসুলভ কৌতুহলে এগিয়ে গেলাম কথা বলতে। অদ্ভুত রকমের সুন্দর মুখশ্রী, হাসলে মনে হয় চারপাশ আলোকিত হয়ে গিয়েছে। কথায় কথায় জানলাম ও জয়েন্ট ডিগ্রি করছে এমআইটি স্লোআন স্কুল অফ ম্যানেজমেন্ট (এমবিএ) আর হার্ভার্ড কেনেডী স্কুলে( এমপিএ, আমি যেটা করছি)।

একটু পর পরিচয় হল ক্রিসের সাথে।উচ্চতা নিয়ে আমার যে গর্ব ছিল, ক্রিসকে দেখে তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আফ্রিকান আমেরিকান ছেলে, কলেজ রাগবি টিমের সাবেক খেলোয়াড়- হ্যান্ডসেক করার সময় মনে হল হাতটা খুলে আসবে সকেট থেকে। ওর হাসিটা আরও সুন্দর- যখন হাসে সমস্ত শরীর কাঁপিয়ে হাসে, মনে হয় আরে, এ তো আমার আপন ভাই! ও কাজ করে কনসালটেন্সি ফার্ম ম্যাকেঞ্জিতে, বছরে দেড় লাখ ডলার কামায়।টাকাপয়সা জমিয়ে হার্ভার্ডে মাস্টার্স করতে এসেছে।

এখানে একটা জিনিস দেখলাম। যত কোয়ালিফায়েড, ধনী আর গুডলুকিং-ই হোক না কেন, অন্তত আমি যাদেরকে পেয়েছি এরকম এরা সবাই মানুষকে মানুষ ভাবে, শেয়াল কুকুরের মত আচরণ করেনা। এটা হয়ত আমার দুর্ভাগ্য, দেশে এধরণের মানুষ আমি খুব বেশি পাইনাই যাদের একই সাথে গুণ,রূপ, অর্থ সবই আছে কিন্তু সেটা নিয়ে অহংকার নাই। সামান্য একটু রূপ আর বিদেশি ডিগ্রির দাপটে এরা যে কি কদাকারভাবে অন্য মানুষকে ছোট করে, নিজের ফায়দা হাসিলের জন্য ওই এক চিমটি রূপ আর দুই চিমটি যোগ্যতাকে ব্যবহার করে বোকাসোকা ছেলেমেয়েদের ম্যানিপুলেট করে- এরা যদি এখানের ছেলেমেয়েগুলোর মত হত তাহলে সম্ভবত এদের অত্যাচারে বনবাস নিতে হত।

বাংলাদেশ পুলিশের একজন এ্যাডিশনাল আইজি আছেন- কাশেম স্যার।এই ভদ্রলোক মেট্রিক ইন্টারমিডিয়েট দুটোতেই সম্ভবত ফার্স্ট স্ট্যান্ড করেছিলেন, পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিনান্সে ওরকম ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট বা সেকেন্ড হয়েছিলেন। উনাকে সুযোগ পেয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “স্যার, আপনি পুলিশের এত বড় অফিসার, সেই সাথে এরকম অসাধারণ মেধাবী- অথচ আপনার সাথে কথা বলে এর কিচ্ছু টের পাইনা। কিভাবে এরকম অসামান্য সাধারণ জীবন যাপন করেন?”

কাশেম স্যারের দেয়া উত্তরটা ডায়রিতে লিখে রেখেছি- “আমি স্বীকার করি আমি মেধাবী। তবে আমার এই মেধা স্বয়ং স্রষ্টার দান, ইটস হিজ ফ্রি উইল দ্যাট হি গেভ মি মেরিট।স্রষ্টার ইচ্ছে হয়েছে উনি আমাকে মেধা দিয়েছেন, উনার ইচ্ছা হলে আমাকে না দিয়ে উনি অন্য কাউকে দিতেন। এইটা নিয়ে অহংকার করার কি আছে?”

অহংকার স্রষ্টার অলঙকার, তাঁর গায়ের ভূষণ।সামান্য মানুষ হয়ে উনার ভূষণ নিয়ে টানাটানি করাটা ঠিক না।

আজ আপাততঃ এটুকুই!
#হার্ভার্ড

Comments

comments