image

প্রেমিক

“প্রেমিক”

( জাপানী মরমী কবি তামাহোমা-সানের(১৮৮৪-১৯৮৪) সুদীর্ঘ কবিতা। প্রিয় সামুরাই শিষ্য হু-সেন ((মতান্তরে হু-সান) যখন কবির কাছে প্রেমিকের সংজ্ঞা জানতে চায়, তিনি তখন এ কবিতাটি বর্ণনা করেন। বঙ্গানুবাদ এই অধম )

বসিয়াছিলেন কবি তামা-হোমা শান্ত নদীর তীরে,
শিষ্য হু-সান পাশে আসিয়া দাঁড়াইল নতশীরে।
হু-সান ছিল দারুণ যোদ্ধা সামুরাই দুর্বার,
তরবারী হাতে করিত সকল বিপত্তি চুরমার।
টোকিও শহর কাঁপিয়া উঠিত তার রণ-হুংকারে,
ভীষণ ত্রাসে কাঁপিত হৃদয় শত্রুরা হেরি তারে।
শতশত্রুর রক্তে রাঙ্গানো হু-সানের তরবারি
সেই হু-সান আজ ছাড়িয়া আসিলো সংসার, ঘরবাড়ি!
বিরস বদনে মলিন কত্থনে হাঁপুস নয়নে কাঁদি,
হু-সানেরে দেখি স্তব্ধ উভয়ই- কবি আর বিবাদী!

তামা-হোমা তাঁর দরাজ স্বরে কহিলেন “ওহে হু-সেন!,
ব্যাঘ্র নয়নে কেন আজি ঝরে শ্রাবণের ধারা হেন?”
দ্রবীভূত চোখে তুলিয়া মাথা হু-সেন কহিলো “প্রভূ,
সামুরাই আমি, রণ শিখিয়াছি, শিখিনাই প্রেম কভূ!”
“ধূলি-মুখ” নামের বিদ্যাপীঠে দেখেছিনু এক নারী,
প্রেমভরা বুকে দিয়েছিনু তারে আপন হৃদয়-বাড়ি।
দেখেছিনু আমি হাজার স্বপন ঘিরিয়া তাহারে বুকে
চিরিয়া সে বুক চলি গেছে সে-যে অন্য নরের সুখে।
সামুরাই আমি,শত আঘাতেও হেলিনাই এক শিষ,
সেই আমি আজ হৃদয় দহনে পুড়িছি অহর্নিশ-

কি ভীষণ জ্বালা এ যে-
নরক আগুনও ইহার কাছে লুকাইবে পরম লাজে!
এসেছি জানিতে তাই-
বলে দিন মোরে কি করিয়া আজ “প্রেমিক” সংজ্ঞা পাই?

হাসিয়া কহেন কবি,
“প্রেমিক অঙ্গ দুই রূপ ধরে,ঠিক যেন শশী-রবি!
প্রথম রূপের প্রেমিক সে হয় সংসারে সু-সফল,
শত রমনী প্রেম দেয় তার চরণেতে সুকোমল!
শরীরী প্রেমের অভাব তাহার হয়নাকো কোনকালে,
হৃদয়ের প্রেম ফাঁকি দেয় তারে প্রতিক্ষণে, ফাঁকতালে!
ভোগ-দেবতার পূজারী প্রেমিক আনন্দে করে ভোগ,
চির-উত্তাল রমণের সুখ, পরম জীবন-যোগ!

এ-হেন ভোগের ফাঁকে,
বুকফাটা ক্ষত প্রেমিক সে তার যতনে লুকায়ে রাখে।
কোন এক কালে প্রেম সংগ্রামে বরণ করিয়া হার,
প্রতিশোধ তার লইতাছে যেন এ প্রেমিক, দুর্বার!
শত নারী সনে শত সঙ্গমে খুঁজিতে চাহিয়া সুখ,
ক্ষণিক তৃপ্তি লইয়া ফেরে সে, অবনত করি মুখ!
হারানো প্রেমের অগ্নিকুণ্ডে ছিটাইয়া রমণ সুধা,
হায়রে আশিক, মিছে আশা তার নিভাইয়া দিবে কে-বা?

মেনে লয়ে এ নিয়তি
প্রেমিক পুরুষ নীরবে হাসিয়া বাড়ায় জীবন জ্যেতি।
“শত চেষ্টা করিয়া যদি-বা ও রতন নাহি পাই,
কাঁচকে করিয়া রতন আমি- জীবনের গান গাই!”
দৈহিক সুখ সে-ও বড় সুখ, নাইবা পেলাম মন-
মরণ পূর্বে ভোগিব তাহায় প্রতিক্ষণ, প্রাণপণ!”

শুনিয়া কহে হু-সান,
এ যেন মম স্বীয় প্রেমকথা শুনাইছ- ভগবান!
প্রথম জীবনে নব যৌবনে ইহাই ছিলাম আমি,
রমণসুখের বাসনা ছিল সোনার চাইতে দামী!
ভাবিয়াছিলাম যোদ্ধা আমি, জীবনের নাহি ঠিক-
সুখ লয়ে যাই, যতখানি পারি ভুলিয়া দিগবিদিক!

সহস্র রমণ পরে,
ক্ষান্ত হইনু অবশেষে আমি “ধূলি-মুখ” নারী তরে!
শত নারী মোরে ত্যাগিয়াছে আর আমি ত্যাগিয়াছি শত,
তবে কহো, প্রভূ, শুকায়না কেন একটি নারীর ক্ষত??

হাসিয়া কহেন কবি-
এইবার তবে আঁকিব হু-সান! দ্বিতীয় প্রেমিক-ছবি!
এতক্ষণ ধরি যে বিবরণ প্রথম প্রেমিক তরে,
উলটো হইবে সবটি তাহার দ্বিতীয় প্রেমিক পরে!
বহু ভোগ নয়,দ্বিতীয় প্রেমিক এক নারী ধরে শিরে,
সেই নারী তরে সকল সুখ হৃদয়ে তাহার ভীড়ে।
সব নারী চায় এমন পুরুষ হইবে শুধুই তার,
কিন্তু এমন পুরুষ তো, নাই- সকলই মিথ্যাচার!
পুরুষ মাত্র বহুগামী , কেহ মনে কেহ দেহে-
অন্যরকম থাকেবা যদিও, সেও মনে মনে চাহে।

“একজনও নাই মহান পুরুষ” করিনাকো হেন দাবী,
শুধু দাবী করি অতীব কঠিন সে মানব-মনচাবি।
দ্বিতীয় জাতের প্রেমিক মনের চাবির পাইতে দিশা,
হেন কলিকালে শুধু দেখি আমি দিনের বেলায় নিশা!

কবি-আমি, বলে যাই-
বলিওনা কভূ, প্রেমিক আমার-শুধুই অমন চাই!

শুনিয়া হু-সেন কহে-
প্রেমের যাতনা কহো তামা-হোমা,কেমন করিয়া সহে?
প্রথম এবং দ্বিতীয় জাতের বর্ণিত দু-প্রেমিক,
কার প্রেম কহো সত্যি জগতে, কার কথা না-সঠিক?

মৃদু-স্বরে কহে কবি,
তিষ্ট, হু-সেন, শিষ্য আমার! বর্ণিব আজ সবই!
শত রমণের ভক্ত যে জন, প্রেম মিছে নয় তার,
হারানো প্রেম খুঁজে ফেরে ও-সে, রতিসুখে বারবার।
এক-নারী সনে রহে যে প্রেমিক, ভালবাসা যার খাঁটি,
তাহার মনেও অন্য রমনী মাঝে মাঝে যায় হাঁটি।

এইটুকু শুধু বলি,
করিওনা তুমি বিচার কাহারো খেলি রক্তের হোলি!
হারানো প্রেমের দুখ,
কভূ পারিবেনা ভুলিতে তাহারে যত হও উন্মুখ।

প্রেমের বেদনা ভুলিতে উপায় কহি আমি তামা-হোমা,
যত নির্মম হোক না ও জন করি দাও তারে ক্ষমা!
কভূ কহিওনা প্রেমসুখ তব কেন হয়ে গেল শেষ-
বরং হাসিয়া কহো নিজে নিজে, “যাহা হইয়াছে, বেশ!”
যাহাই ঘটুক করিও গ্রহণ হাসি্রাঙা মুখে আজ,
যদি পারো তবে জেনে রেখ বাছা, তুমিই রাজাধিরাজ!!!”

(কবি তামাহোমা-সান এই অধমের মস্তিষ্কপ্রসুত কাল্পনিক কবি, তাঁকে গুগল করে বিভ্রান্ত হবেন না )

Comments

comments