Surya_Sen_Statue_-_Esplanade_-_Kolkata_2011-12-18_0347

মাস্টারদা সূর্যসেন বনাম হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা

আমার শারদীয় শুভেচ্ছা দেয়া পোস্টটি প্রকাশের পর স্বাধীনতাবিরোধী, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি স্বনামে এবং বেনামে মুখরিত হয়ে উঠেছে এর ছিদ্রান্বেষন করতে। এই ব্যাপারটি আজকাল নিয়মিতই ঘটছে- কোন একটি লেখা দিই, সেখানের ফাঁকফোঁকর বের করার নোংরা অপচেষ্টা করা হয়, তারপর আমাকে বসতে হয় রেফারেন্স বই নিয়ে। একই ঘটনা ঘটেছে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা সংক্রান্ত পোস্টে, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পুত্রের আর্থিক অবস্থা সংক্রান্ত ঘটনায়, এবং সর্বশেষ মাস্টারদা সূর্যসেনকে অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করায়।

একটা বিষয় সুস্পষ্টভাবে বলে দিই, আমি যেহেতু মানুষ- যে কোন বিষয়ে আমার ভুল হলে সেটি মেনে নিতে কোনও আপত্তি নেই আমার। তবে অসৎ উদ্দেশ্যে, মনগড়া এবং বিকৃত তথ্য দিয়ে যখন কেউ বাহাসে আসে, সেটাকে যথোপযুক্ত রেফারেন্স দিয়ে খণ্ডন করতে চেষ্টা করি।

শারদীয় শুভেচ্ছা জানানোর “অপরাধে” আমাকে “ধর্মবিরোধী”, “ইসলামের শত্রু”, “ভারতের দালাল”, “র এর এজেন্ট”, “প্রমোশনপ্রার্থী” ইত্যাদি যেসব নোংরা কথাবার্তা বলা হয়েছে তাতে বেশ বুঝতে পারছি, আঘাতটা জায়গা মতই লেগেছে। ধর্মান্ধ, বর্বর, সাম্প্রদায়িকতার বিষে আচ্ছন্ন এই মানুষগুলোর(?!) কাছে নিজেকে প্রমাণ করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে বা প্রয়োজন আমার নেই। সামান্য শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময়ের ফলে যাদের গাত্রদাহ হয়, এদের দৌড় বড়জোর ফেসবুকে বানোয়াট কথাবার্তা বলা পর্যন্তই।

তবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলের অগ্নিযুগের বিপ্লবী চট্টলার গর্ব মাস্টারদা সূর্যসেনকে নিয়ে অনেক শিক্ষিত মানুষের ভেতরেও ভুল ধারণা আছে। এঁরা অনেকেই মনে করেন, মাস্টারদা বিপ্লবী এবং দেশপ্রেমিক বীর হলেও তিনি আসলে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করতেন। কাজেই, কোন অবস্থাতেই তাঁকে অসাম্প্রদায়িকতার উদাহরণ হিসেবে দেখানো যাবেনা।

এই সুনির্দিষ্ট ধারণাটি দুর করতে আমার আজকের পোস্ট।

মাস্টারদা সুর্যসেন যদি কট্টর হিন্দুত্ববাদী হতেন, তাঁর দলের কোন কার্যক্রমেই কোন মুসলমানের সম্পৃক্ত থাকার কথা না। অথচ ডকুমেন্টেড ফ্যাক্ট হিসেবে আমরা দেখতে পাই, তিনি মুসলমানদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা পেয়েছেন।

প্রথম উদাহরণ বিপ্লবী আব্দুস সাত্তার (১৯১৭-১৯৭৯)। তাঁর সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্যে পাওয়া যায়, “জন্ম রাউজান বাগোয়ান ইউনিয়নের পাঁচখাইন গ্রামে। ছাত্রজীবন থেকেই বিপ্লবী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। ছাত্র অবস্থায় মাস্টারদা সুর্যসেনের সান্নিধ্য লাভ করেন।মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে মাস্টারদার প্রিয় ছিলেন আব্দুস সাত্তার। ১৯৩৪ সালে গ্রেপ্তার হয়ে রাজবন্দী হিসেবে জেল খাটেন। জেল থেকেই আইএ পাস করেন। ১৯৩৮ সালে মুক্তি পেয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। তিনি ছিলেন কৃষক সমিতির আজীবন নেতা, কমরেড। আত্মগোপনে কাটান অনেক বছর। স্বাধীনতার পর তিনি একবার রাউজানে সংসদীয় নির্বাচন করেন। ১৯৭৯ সালে সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যান”।

বিপ্লবী অনন্ত সিংহের “অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রাম” বই থেকে পাই,

“আর একজন জাহাজী মুসলমান বন্ধু – নাম তার ইয়াকুফ। খুব চতুর ও স্মার্ট। চলনে বলনে পোষাকে খুব কেতা দুরস্ত। ইনিই আমাদের সবচেয়ে বেশি অস্ত্র দিয়েছেন। এক একবার একভাবে delivery দিয়েছেন। একবার ঠিক সময়ে একটা খুব বড় প্রাইভেট গাড়ি এসে নির্ধারিত স্থানে থামল। আমি ও অনুকূলদা পাঁচ মিনিট আগে থেকে দাড়িয়েছিলাম। গাড়িটি থামার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াকুফ ও আরেকজন খুব জাদরেল লোক গাড়ি থেকে নেমে গেলেন। ঈংগিতে দেখিয়ে গেলেন পেছনের seat এর পা রাখবার জায়গায় একটা পোঁটলা আছে। তাঁরাও চলে গেলেন আর অনুকূলদা পোঁটলাটা সরিয়ে নিলেন। গাড়ি পূর্ণ বেগে মোড় ঘুরে উধাও।”

মাস্টারদার দলে যে মুসলমান সদস্যও ছিলেন, তার প্রমাণ নীচের লাইনগুলোতেপাওয়া যায়ঃ

“দু’টি ভাগে টাকা নিয়ে কলকাতা পর্যন্ত যাবার দায়িত্ব দিতে হবে দুটি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য সভ্যের উপর। আবার তার উপর পুলিশের নজর থাকলে চলবে না। ঠিক হল এক টাকা ও পাঁচ টাকা নোটের তাড়াগুলি একটা সুটকেশে ভরে নিয়ে যাবে অম্বিকাদা। আর দশ টাকার নোটের তাড়া যাবে দলিলর রহমান নামে দলের একজন খুব বিশ্বাসী সভ্যের সঙ্গে।”

এছাড়া সাধারণ মুসলমানরাও যে এই আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় নীচের লাইনগুলোতেঃ

“একটি মুসলিম মায়ের কথা এই প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ছে। ফতেয়াবাদের বড় দীঘির পাড়ে বৃদ্ধা বিধবা ফয়েজুন্নেসার বাড়িতে আমি দুই দিন দুই রাত্রি ছিলাম। তখন তাঁর ১৭/১৮ বছরের ছেলে ফজল আহমদ জালালাবাদ পাহাড়ে একটি ওয়েলবি রিভলবার কুড়িয়ে পায় ও এবং আমাকে তা এনে দেয়। তার জন্য কিছু দাম বা পুরস্কার আমি ঐ ফয়েজুন্নেসা বিবিকে দিতে গেলে, তিনি বলেন, এইটি দিয়ে একটা সাহেব (ইংরেজ) মারলে আমি বেশী খুশি হব।”

এ তো গেল বিচ্ছিন্ন উদাহরণ। সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধ্যপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর “১৮৫৭ এবং তারপর” বইটিতে বলেছেন, “সুর্যসেনদের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান ছিলনা। বিপ্লবীদের অন্যান্য সংগঠন ধর্মের নামে দেবমূর্তির সামনে শপথ নিত, সুর্যসেনরা তা নিতেন না, তাঁরা ছিলেন পরিপূর্ণরূপে ইহজাগতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ। ১৯২৯ সালে সূর্যসেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক ছিলেন, কংগ্রেসের কর্মসূচীতে তিনি অংশ নিয়েছেন, কিন্তু কংগ্রেস তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। কংগ্রেসের আবেদন নিবেদন ও ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করে তিনি বিপ্লবী দল গঠন করেন” ( পৃষ্ঠা-৩৯, ছবি সংযুক্ত)

মাস্টারদার ফাঁসির আগে লিখে যাওয়া শেষ চিঠিতে তিনি বলেনঃ

“আমার শেষ বাণী- আদর্শ ও একতা। ফাঁসির রজ্জু আমার মাথার উপর ঝুলছে। মৃত্যু আমার দরজায় করাঘাত করছে। মন আমার অসীমের পানে ছুটে চলছে। এই তো সাধনার সময়। বন্ধুরূপে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার এই তো সময়। ফেলে আসাদিনগুলোকে স্মরণ করার এই ত সময়।

কত মধুর তোমাদের সকলের স্মৃতি। তোমরা আমরা ভাই-বোনেরা তোমাদের মধুর স্মৃতি বৈচিত্রহীন আমার এইজীবনের একঘেঁয়েমিকে ভেঙে দেয়। উৎসাহ দেয় আমাকে। এই সুন্দর পরম মুহূর্তে আমি তোমাদের জন্য দিয়েগেলাম স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন। আমার জীবনের এক শুভ মুহূর্তে এই স্বপ্ন আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। জীবনভর উৎসাহভরে ও অক্লান্তভাবে পাগলের মতো সেই স্বপ্নের পেছনে আমি ছুটেছি। জানি না কোথায় আজ আমাকে থেমে যেতে হচ্ছে। লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে মৃত্যুর হিমশীতল হাত আমার মতো তোমাদের স্পর্শ করলে তোমরাও তোমাদের অনুগামীদের হাতে এই ভার তুলে দেবে, আজ যেমন আমি তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছি। আমরা বন্ধুরা এগিয়ে চল, এগিয়ে চল- কখনো পিছিয়ে যেও না। পরাধীনতার অন্ধকার দূরে সরে যাচ্ছে। ঐ দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার নবারুণ। কখনো হতাশ হয়ো না। সাফল্য আমাদের হবেই। ভগবান তোমাদের আশীর্বাদ করুন।”

মাস্টারদা সুর্যসেনের জীবদ্দশায় তিনি সরাসরি মুসলমানদের বিরূদ্ধে কোনরকম সাম্প্রদায়িক আচরণ করেছেন, এরকম কোন প্রমাণ বা ডকুমেন্টস নির্ভরযোগ্য কোন সূত্রে পাওয়া যায়না, পাওয়া যায় কেবলমাত্র ধর্মান্ধ, বর্বর, বাংলা মায়ের বুকে নোংরা নিঃশ্বাস ফেলা বরাহশাবকদের পূঁতিগন্ধযুক্ত মননে।

আগে যা বলেছিলাম আবারও বলছি, সূর্যসেন আর জগৎজ্যেতি দাশের রক্তস্নাত পূণ্যভূমি বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান নেই।

প্রিয় পাঠক, এর পরে মহান বিপ্লবী সূর্যসেনকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে পরিচিত করিয়ে দেবার অপচেষ্টাকারীদেরকে আশা করি দাঁত ভাঙা জবাব দিতে পারবেন।এ লেখাটি আমার ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করছি রেফারেন্স হিসেবে রাখার জন্যে।

সবাইকে আবারও শারদীয় শুভেচ্ছা!

12112246_1650801895196775_1124206403375447941_n12140582_1650801931863438_2986933879676850841_n কৃতজ্ঞতা_প্রকাশঃ‬ সবজান্তা সিধু জ্যাঠা, যিনি কষ্ট করে রেফারেন্স যোগাড় করে দিয়েছেন।

Comments

comments