Tun-Memoir-Cover

মাহাথির মোহাম্মদ ও সেল্ফ হেল্প প্রসঙ্গে

“সেলফ-হেল্প লিটারেচার” এর সাথে মনে হয় আমরা সবাই পরিচিত। গালভরা এই নামের অন্তর্ভুক্ত যে বইগুলো সেগুলো হচ্ছে আত্ম-উন্নয়নমূলক-অর্থাৎ পাঠক এই বইগুলো পড়ে নিজে নিজেই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবেন।যাঁরা এখনো ভ্রূ কুঁচকাচ্ছেন তাঁদের জন্যে একটি উদাহরণঃ সদ্য”প্রয়াত” ডেসটিনি গ্রুপ তাদের সদস্যদের মাল্টি লেয়ার মার্কেটিং-এর মাধ্যমে জীবন পালটে ফেলার জন্যে যেসব বই বিক্রি করত সেগুলোর মধ্যে ভারতীয় লেখক শিভ খেরার “You Can Win” বা “তুমিও জিতবে” অন্যতম।আর যাঁরা একটু পুরোন পাঠক, তাঁরা নিশ্চয়ই ডেল কার্নেগীর “বন্ধু ও প্রতিপত্তিলাভ” বইটার কথা শুনেছেন!

প্রতিটি সেলফ হেল্প বইয়ের শুরুতেই একটি কমন কথা থাকেঃ

…পৃথিবীতে দুই ধরণের মানুষ আছে। ১) যাঁরা ভাগ্যের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে বিফল হয়ে বসে থাকে আর ২) যারা নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে সক্ষম। তুমি দ্বিতীয় দলে পড়ো, কারণ এই বইটা তুমি কিনেছ। এই বইটা পড়লেই তোমার যাবতীয় শারীরিক/মানসিক/মৌন/যৌন সব সমস্যা এক ফুৎকারে উড়ে যাবে …

কেউ যাদুমন্ত্রের মত এইসব মোটিভেশনাল বই পড়ে নিজের জীবনকে আকাশসম উচ্চতায় নিয়ে যাবেন এমনটি ভাবা বাতুলতা। অর্থনীতির বর্তমান সময়ে খুব নামকরা একটা বই আছে- “ফ্রিকোনমিক্স”। এই বইতে মজার একটা উদাহরণ দেয়া

এই বইতে চমৎকার একটি উদাহরণ দেয়া আছেঃ পাশ্চাত্যে যেসব পিতামাতাদের সন্তানদের লালন পালন করার জন্যে ডজনখানেক “কিভাবে সন্তান মানুষ করবেন” টাইপের বই কেনেন তাদের সন্তানেরা সাধারণত চমৎকার মানুষ হয়। এর মানে কিন্তু এই না যে ওই বইগুলো পড়েই বাবা-মা-রা সন্তান লালন পালনের মত জটিলস্য জটিল একটি বিষয় শিখে ফেলেছেন।তবে যেসব বাবা-মা তাদের সন্তান লালন পালন আরো ভালোভাবে কিভাবে করা যায় এটি শিখতে এতগুলো বই কেনেন- এই অভ্যাস থেকে বোঝা যায় যে তাঁরা তাঁদের সন্তান লালন পালনের ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। সন্তান মানুষ হয় মূলতঃ ওই সিরিয়াসনেসের ফসল হিসেবেই।ঠিক একইভাবে, একজন শিক্ষিত পাঠক যখন আত্ম-উন্নয়নের এতগুলো বই কেনেন, এর অর্থ নিজের উন্নতির ব্যাপারে তিনি সিরিয়াস। যেসব পাঠক এই বইগুলো পড়ে নিজের জীবন পালটে ফেলেছেন বলে দাবী করেন তাঁদের উন্নতির রহস্য আসলে বই না,আসল রহস্য হচ্ছে তাঁদের ওই সিরিয়াসনেস। মোটামুটি মেধাবী একজন মানুষ লেগে থাকলে জীবনে উন্নতি করবেন- এটা বোঝার জন্যে কমন সেন্সই যথেষ্ট।

আমাদের বিদগ্ধসমাজ ( কেউ কেউ আদর করে সুশীল বা আঁতেলসমাজও বলে থাকেন) এইসব সেলফ হেল্প বইগুলোকে “পরম মমতায়” তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে থাকেন। আমি যেহেতু ওই দলে পড়িনা, কাজেই তাঁদের চোখ এড়িয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে এই সেলফ হেল্পের বই আমি নিয়মিতই কিনি এবং পড়ি। Robin Sharma এই সেলফ হেল্প জগতের মাস্তান লোক। তাঁর The Monk Who Sold His Ferrari বইটাকে এই সেলফ হেল্প লিটারেচারের একটি মডার্ন ক্লাসিক বলা যেতে পারে। তাঁর আরেকটা বই আছে, The Greatness Guide. লেখক এই বইয়ে চমৎকার একটি উপদেশ দিয়েছেন- সেটি হচ্ছে, “Everyday, have a conversation with Gandhi”. -প্রতিদিন গান্ধীর সাথে বাতচিৎ করো ।

গান্ধীজীর সাথে কিভাবে আপনি কথা বলবেন, তাও তাঁর মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পর??

খুব সহজ। My Experiments with Truth খুলে বসুন।পড়া শুরু করুন। মহাত্মা গান্ধী নিজের ভাষায় বলছেন নিজের জীবনের কথা। জন্মের পর তাঁর সংগ্রামের কথা, সত্যের সন্ধানে লড়াইয়ের কথা, অহিংস আন্দোলনের প্রস্তুতির কথা।

কি, মনে হচ্ছেনা আপনি গান্ধীর সাথে কথা বলছেন? শুধু কি তাই? গান্ধীজীর সাথে আপনার কথা হচ্ছে আপনার নিজের সময়ে, যতক্ষণ ইচ্ছে ততক্ষণ।

ঠিক এইভাবে, এক একজন মহামনীষীর সাথে কত্থোপকত্থনের এপয়েন্টমেন্ট আপনি নিজেই ঠিক করবেন।আপনার সাথে কথা বলার জন্যে অপেক্ষা করবেন স্টিভ জবস, মহাত্মা গান্ধী কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলা। মানবজাতির এই কৃতী সন্তানদের সাথে কত্থপকত্থনের ফলে তাঁদের সূর্‍্যসম ঔজ্জ্বল্যের ছিঁটেফোটা আপনার উপরেও পড়বে। একেকটি আত্মজীবনী পড়বেন, আপনার মানসিক ঔজ্জ্বল্য একটু করে বাড়বে। ম্যান্ডেলা আপনাকে শেখাবেন কিভাবে ২৭ বছর কারারূদ্ধ থেকেও তিনি আশা ধরে রেখেছিলেন, গান্ধীর কাছে শিখবেন কিভাবে তিনি অহিংসভাবে একটা গোটা সাম্রাজ্য ধ্বসিয়ে দিয়েছিলেন- স্টিভ জবস আপনাকে বলবেন কিভাবে তিনি প্রযুক্তির সংজ্ঞাটাকেই পালটে দিয়েছেন। স্টিভ কোভি’র 7 Habits of Highly Effective People বা টনি রবিন্সের Awaken The Giant Within নয়, আমার কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ সেলফ হেল্প লিটারেচার তাই এই আত্মজীবনীগুলো।

নির্বাচনের কারণে গত তিন দিন থানাতেই ঘুম থানাতেই খাওয়া, বাসায় যাবার অবকাশ পাইনি। বাবা মা মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন, এই আজ তাঁরা আসলেন। বাবাকে বলেছিলাম মাহাথিরের আত্মজীবনী পাওয়া গেলে নিয়ে আসতে। এয়ারপোর্ট যেহেতু আমার এলাকায় পড়ে, তাই একফাঁকে তাঁদের রিসিভ করতে গিয়েছিলাম। আমার বাবাও আমার মতই বইপাগল, প্লেন থেকে নেমেই আমার হাতে বইটা তুলে দিলেন। তিনি জানেন, তাঁর ছেলের কাছে সবচাইতে প্রিয় উপহার হচ্ছে বই-ঠিক তাঁর মতই।

সারাংশটা বইয়ের পেছনের ফ্ল্যাপ থেকে সংক্ষেপে তুলে দিচ্ছিঃ

…পশ্চিম তাঁকে ডাকে বর্ণবিদ্বেষী আর দাম্ভিক হিসেবে। উন্নয়নশীল দেশের কাছে অবশ্য তিনি একজন দূরদর্শী নেতা, যিনি গোটা তৃতীয় বিশ্বকে মাথা উঁচু করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। মালয়েশিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তুন ডাঃ মাহাথির মোহাম্মদ পৃথিবীর সবচাইতে উপেক্ষিত কিছু অঞ্চলকেও উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের আশা জাগিয়ে দিয়েছেন- তাঁর সবচাইতে বড় সমালোচকও এটা উপেক্ষা করতে পারবেনা।

…তাঁর এই কর্মজীবন বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। মাহাথিরের ২২ বছরের নেতৃত্ব একই সাথে একনায়কসুলভ এবং অনুপ্রেরণাদায়ক। খুব অল্প নেতাই পেরেছেন একটি গোটা দেশকে আদিম কৃষিসমাজ থেকে পালটিয়ে শিল্পের পাওয়ারহাউস হিসেবে গড়ে তুলতে। তার চাইতেও কম নেতা পেরেছেন মাত্র দুই দশকে এটি করে দেখাতে।

… আধুনিক মালয়েশিয়া গড়তে নিজের অনন্য ভূমিকার কথা ডাক্তার মাহাথির পুরো সার্জিকাল দক্ষতায় তুলে ধরেছেন এখানে…

1497484_608114812557576_1298536733_nনতুন বই হাতে পেয়ে জিভ লালায় টইটম্বুর। হার্ড কভার, ঝকঝকে বাঁধাই। আপনাদের হিংসা জাগাতে পাশে একটা ছবি দিলাম!

 

সবশেষে বুকের ভেতরে ধুকপুক করা একটা প্রশ্নঃ

আমার দেশের অবাক করা উন্নয়নের গল্পও কি আমার মতই আগ্রহ নিয়ে কোন ভিনদেশী পাঠক একদিন পড়বেনা? কত দূরে সেই দিন? আজ? কাল?? ঠিক কবে??

Comments

comments